03May

ক্যান্সার নিয়ে যত ভাবনা

অধ্যাপক ডাঃ মোঃ মোশাররফ হোসেন
প্রাক্তন পরিচালক- জাতীয় ক্যান্সার গবেষনা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল
ভেবেছিলাম একটা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখবো। কিন্তু লিখতে গিয়ে মনে হলো যে দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী চিকিৎসার আওতায় নেই, তাই তাদের জন্য কিছু লিখা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১ জনক্যান্সরে আক্রান্ত হয়। সে হিসাবে দেশে প্রায় ১৫ লক্ষ ক্যান্সার
রোগী আছে। প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ২.৫ লক্ষ মানুষ এ রোগে মারা যাচ্ছে। হিসাবে দেখা যায়, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১ লক্ষ রোগী চিকিৎসার জন্য আসে। আর বাকি ২ লক্ষ রোগী চিকিৎসার আওতায় নেই। আর এর মূলে রয়েছে, রোগ সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা, চিকিৎসার অপ্রতুলতা, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং নানাবিধ টোটকা চিকিৎসা। সেটা ছিল ১৯৮৫ সাল। সবে-মাত্র ডাক্তারি পাস করেছি। আমার নানার পাকস্থলীতে ক্যান্সার ধরা পড়লো। পুরো পরিবারে
অস্থিরতা। চিকিৎসা করাবে, কী করাবে না। দেশে করাবে, না বিদেশে? এ রোগের আদৌ কোনো চিকিৎসা আছে কি-না ? আবার কারো মতামত হলো, চিকিৎসা করে লাভ কী ? রোগী বেশি দিন বাঁচে না। এরপরও চট্টগ্রামের একটি হোটেলে ৩টি রুম ভাড়া নিয়ে আমরা অনেকে মিলে নানার চিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে
যাচ্ছিলাম। কেউ বললো অমুক স্যারকে দেখাও, আবার কেউ বললো ওনাকে নয়, আর একজনকে দেখাও। কারো মতামত এ স্যার সার্জারি করবে না, বরং অন্য স্যারকে দেখাও, উনি সবসময় পকেটে ছুরি কাচি নিয়ে ঘুরেন, যত কঠিন সার্জারিই হোক না কেন উনি করে দেবেন। পরিবারের কারো মত এই বয়সে সার্জারি নয়, মেডিসিন দিয়ে কিছু হয় কি না দেখ। আমরা শুধু গোলক ধাঁধায় ঘুরছিলাম। এখন বুঝি, রোগটি ছিল শেষ
পর্যায়ে। আর পারিবারিক সিদ্ধান্তহীনতাই এর জন্য দায়ী ছিল। কারণ সিদ্ধান্ত নিতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া টাকার জোগাড় করাও এর জন্য কিছুটা দায়ী। তিন মাস এদিক সেদিক দৌঁড়াদৌঁড়ি করে গ্রামে
নিয়ে এলাম। প্রচন্ড হয়রানির শিকার হলাম। আর চিকিৎসা, সে তিমিরেই রয়ে গেল।আজ আমি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। এখন মনে হয় একটি সঠিক সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে হয়রানি বা পেরেশানির হাত
থেকে কতটুকু বাঁচাতে পারে। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর পরিবারও আত্মীয়-স্বজনকে চিকিৎসা, চিকিৎসার ধরন, চিকিৎসার ফলাফল ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া দরকার। এক পরিবারকে অন্তত এটুকু বলা দরকার, এটা চিকিৎসা করালে এটুকু পর্যন্ত ফল পাওয়া যেতে পারে। আজ খুব ভালোভাবে বুঝি এর জন্য বিদেশে গিয়ে টাকা-পয়সা খরচ করে পরিবারের বাকি সদস্যদের পথে বসানো ঠিক হবে কি না। ক্যান্সারের চিকিৎসা একটা ফরমুলার মতো। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফরমুলা অনুযায়ী চিকিৎসা করালে দেশে-বিদেশে চিকিৎসার পদ্ধতি একই রকম। আবার সব সময়সব রোগীকে চিকিৎসা করার দরকার হয় না। কিছু কিছু রোগীর চিকিৎসা করালে রোগ ভালো হয়ে যেতে পারে, আবার কিছু রোগী দীর্ঘদিন চিকিৎসা করে কোনো লাভ হয় না। কোনো কোনো রোগী চিকিৎসার পর রোগবিহীন অবস্থায় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে।এটুকু সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে সকল বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা প্রদানকারী কেন্দ্রগুলোর সংখ্যা রোগীর তুলনায় খুবই অপ্রতুল। অন্যদিকে ক্যান্সার চিকিৎসা দীর্ঘদিনব্যাপী করতে হয়। যদি একটি রোগী তার বিকিরণ
চিকিৎসা (রেডিওথেরাপি) শুরু করে, তাহলে তাকে কম করে হলেও ৩০ থেকে ৩৫ দিন থেরাপি নিতে হয়। একটি থেরাপি মেশিনে দিনে সর্বোচ্চ ৫০ জন রোগীর চিকিৎসা করা যায় এবং সংশ্লিষ্ট অনকোলজিস্ট সর্বোচ্চ ১০ জন রোগীকে ভালোভাবে চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কোন কোন কেন্দ্রে প্রতিদিন
২০০ থেকে ৩০০ জন রোগী চিকিৎসা পাচ্ছেন। সে হিসেবে থেরাপি মেশিন এবং সংশ্লিষ্ট অনকোলজিষ্ট এর সংখ্যা খুবই নগণ্য। সার্জারি এবং কেমোথেরাপির ক্ষেত্রে একই সমস্যা বিরাজমান। ফলে, যে রোগীটি প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসার জন্য আসেন, শুধুমাত্র চিকিৎসা শুরু হবার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষার কারণে তার রোগটি শেষ পর্যাযয়ে পৌঁছে যায়। ক্যান্সার রোগীদের রোগের যে কোন পর্যায়ে শতকরা ৮০ জনকে রেডিওথেরাপি বা বিকিরণ চিকিৎসা নিতে হয়। কিন্তু রেডিওথেরাপি প্রদানকারী কেন্দ্রগুলো মানুষের নাগালের বাইরে। ধরা যাক, যে রোগীর বিকিরণ চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন, তাকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা সিলেটের মত বড় শহরে আসতে হবে। চিকিৎসাটি দীর্ঘদিনের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক থেকে দেড় মাসের। অতএব বড় শহরে তাকে আশ্রয় নিতে হয় কোন আত্মীয়ের বাসায় অথবা হোটেলে। রোগীর সাথে পরিচর্যাকারী থাকেন অন্তত আরো দু-একজন। এই দুর্মূল্যের বাজারে এতজন লোকের থাকা খাওয়ার জায়গা দিতে আত্মীয় স্বজন বিব্রতবোধ করেন। হিমশিম খান বাজার করতে গিয়ে। তাছাড়া কুসংস্কার তো আছেই। ক্যান্সার রোগী, আবার কি-না কি হয়! যদিও ক্যান্সার কোন ছোঁয়াছে রোগ নয়। হোটেলে এতগুলো লোকের থাকা খাওয়া একটি ব্যয়সাধ্য এবং কষ্টকর ব্যাপার। এরকম নানাবিধ কারণে অধিকাংশ লোক, অন্তত আমাদের মতো গরিব দেশের মানুষ চিকিৎসা করাতে আসে না। কাজেই চিকিৎসার ব্যয়ভার কিভাবে কমানো যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যান্সার ফাউন্ডেশন, আমার জানা মতে নামমাত্র খরচে রোগীদের থাকা খাওয়া, থেরাপি দেওয়ার জন্য যাতায়াতের ব্যবস্থা, কাউন্সেলিং এবং চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে।

Leave a reply