ভেবেছিলাম একটা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখবো। কিন্তু লিখতে গিয়ে মনে হলো যে দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী চিকিৎসার আওতায়নেই, তাই তাদের জন্য কিছু লিখা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১ জন ক্যান্সরে আμান্ত হয়। সে হিসাবে দেশে প্রায় ১৫ লক্ষ ক্যান্সার
রোগী আছে। প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আμান্ত হচ্ছে এবং ২.৫ লক্ষ মানুষ এ রোগে মারা যাচ্ছে। হিসাবে দেখা যায়, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১ লক্ষ রোগী চিকিৎসার জন্য আসে। আর বাকি ২ লক্ষ রোগী চিকিৎসার আওতায় নেই। আর এর মূলে রয়েছে, রোগ সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা, চিকিৎসার অপ্রতুলতা, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং নানাবিধ টোটকা চিকিৎসা। সেটা ছিল ১৯৮৫ সাল। সবে-মাত্র ডাক্তারি পাস করেছি।
আমার নানার পাকস্থলীতে ক্যান্সার ধরা পড়লো। পুরো পরিবারে অস্থিরতা। চিকিৎসা করাবে, কী করাবে না। দেশে করাবে, না বিদেশে? এ রোগের আদৌ কোনো চিকিৎসা আছে কি-না ? আবার কারো মতামত হলো, চিকিৎসা করে লাভ কী ? রোগী বেশি দিনবাঁচে না। এরপরও চট্টগ্রামের একটি হোটেলে ৩টি রুম ভাড়া নিয়েআমরা অনেকে মিলে নানার চিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেযাচ্ছিলাম। কেউ বললো অমুক স্যারকে দেখাও, আবার কেউবললো ওনাকে নয়, আর একজনকে দেখাও। কারো মতামত এস্যার সার্জারি করবে না, বরং অন্য স্যারকে দেখাও, উনি সবসময়পকেটে ছুরি কাচি নিয়ে ঘুরেন, যত কঠিন সার্জারিই হোক না কেনউনি করে দেবেন। পরিবারের কারো মত এই বয়সে সার্জারি নয়,মেডিসিন দিয়ে কিছু হয় কি না দেখ। আমরা শুধু গোলক ধাঁধায়ঘুরছিলাম। এখন বুঝি, রোগটি ছিল শেষ পর্যায়ে। আর পারিবারিকসিদ্ধান্তহীনতাই এর জন্য দায়ী ছিল। কারণ সিদ্ধান্ত নিতে বেশদেরি হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া টাকার জোগাড় করাও এর জন্যকিছুটা দায়ী। তিন মাস এদিক সেদিক দৌঁড়াদৌঁড়ি করে গ্রামেনিয়ে এলাম। প্রচন্ড হয়রানির শিকার হলাম। আর চিকিৎসা, সে
তিমিরেই রয়ে গেল।আজ আমি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। এখন মনে হয় একটিসঠিক সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে হয়রানি বা পেরেশানির হাতথেকে কতটুকু বাঁচাতে পারে। ক্যান্সার আμান্ত রোগীর পরিবারও আত্মীয়-স্বজনকে চিকিৎসা, চিকিৎসার ধরন, চিকিৎসার ফলাফল ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া দরকার। এক পরিবারকে অন্তত এটুকু বলা দরকার, এটা চিকিৎসা করালে এটুকু পর্যন্ত ফলপাওয়া যেতে পারে। আজ খুব ভালোভাবে বুঝি এর জন্য বিদেশেগিয়ে টাকা-পয়সা খরচ করে পরিবারের বাকি সদস্যদের পথেবসানো ঠিক হবে কি না। ক্যান্সারের চিকিৎসা একটা ফরমুলারমতো। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফরমুলা অনুযায়ী চিকিৎসা করালে
দেশে-বিদেশে চিকিৎসার পদ্ধতি একই রকম। আবার সব সময়সব রোগীকে চিকিৎসা করার দরকার হয় না। কিছু কিছু রোগীরচিকিৎসা করালে রোগ ভালো হয়ে যেতে পারে, আবার কিছু রোগীদীর্ঘদিন চিকিৎসা করে কোনো লাভ হয় না। কোনো কোনো রোগীচিকিৎসার পর রোগবিহীন অবস্থায় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে।
এটুকু সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে সকল বিপর্যয়ের হাত থেকেবাঁচাতে পারে।দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা প্রদানকারী কেন্দ্রগুলোর সংখ্যা
রোগীর তুলনায় খুবই অপ্রতুল। অন্যদিকে ক্যান্সার চিকিৎসাদীর্ঘদিনব্যাপী করতে হয়। যদি একটি রোগী তার বিকিরণচিকিৎসা (রেডিওথেরাপি) শুরু করে, তাহলে তাকে কম করে হলেও ৩০ থেকে ৩৫ দিন থেরাপি নিতে হয়। একটি থেরাপিমেশিনে দিনে সর্বোচ্চ ৫০ জন রোগীর চিকিৎসা করা যায় এবংসংশ্লিষ্ট অনকোলজিস্ট সর্বোচ্চ ১০ জন রোগীকে ভালোভাবে চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কোন কোন কেন্দ্রে প্রতিদিন
২০০ থেকে ৩০০ জন রোগী চিকিৎসা পাচ্ছেন। সে হিসেবে থেরাপিমেশিন এবং সংশ্লিষ্ট অনকোলজিষ্ট এর সংখ্যা খুবই নগণ্য। সার্জারিএবং কেমোথেরাপির ক্ষেত্রে একই সমস্যা বিরাজমান। ফলে, যে রোগীটি প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসার জন্য আসেন, শুধুমাত্র চিকিৎসা শুরু হবার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষার কারণে তার রোগটি শেষ পর্যাযয়ে পৌঁছে যায়।ক্যান্সার রোগীদের রোগের যে কোন পর্যায়ে শতকরা ৮০ জনকে রেডিওথেরাপি বা বিকিরণ চিকিৎসা নিতে হয়। কিন্তু রেডিওথেরাপি প্রদানকারী কেন্দ্রগুলো মানুষের নাগালের বাইরে। ধরা যাক, যে রোগীর বিকিরণ চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন, তাকে ঢাকা, চট্টগ্রাম,রাজশাহী বা সিলেটের মত বড় শহরে আসতে হবে। চিকিৎসাটি দীর্ঘদিনের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক থেকে দেড় মাসের। অতএব বড় শহরে তাকে আশ্রয় নিতে হয় কোন আত্মীয়ের বাসায় অথবা
হোটেলে। রোগীর সাথে পরিচর্যাকারী থাকেন অন্তত আরো দু-একজন। এই দুর্মূল্যের বাজারে এতজন লোকের থাকা খাওয়ার
জায়গা দিতে আত্মীয় স্বজন বিব্রতবোধ করেন। হিমশিম খান বাজার করতে গিয়ে। তাছাড়া কুসংস্কার তো আছেই। ক্যান্সার রোগী, আবার কি-না কি হয়! যদিও ক্যান্সার কোন ছোঁয়াছে রোগ নয়। হোটেলে এতগুলো লোকের থাকা খাওয়া একটি ব্যয়সাধ্য এবং কষ্টকর ব্যাপার। এরকম নানাবিধ কারণে অধিকাংশ লোক,অন্তত আমাদের মতো গরিব দেশের মানুষ চিকিৎসা করাতে আসে না। কাজেই চিকিৎসার ব্যয়ভার কিভাবে কমানো যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যান্সার ফাউন্ডেশন, আমার জানা মতে নামমাত্র খরচে রোগীদের থাকা খাওয়া, থেরাপি দেওয়ার জন্য যাতায়াতের ব্যবস্থা, কাউন্সেলিং
এবং চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। সমাজের আরো কিছু প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগ গ্রহণ করলে আরো বেশি মানুষ চিকিৎসার আওতায় আসবে এবং উপকৃত হবে। ক্যান্সার একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। রোগী বছরের পর বছর রোগ যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে। শুধুমাত্র দীর্ঘজীবনের জন্য নয় বরং রোগ যন্ত্রণা লাঘবের
জন্যও চিকিৎসা করাতে হয়। সারাদিন কাজ থেকে ঘরে ফিরে ছেলেটি যখন দেখে, বাবা বা মা রোগ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তখনতো আর চুপ করে বসে থাকা যায় না। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় অথবা অজ্ঞতাবশত টোটকা চিকিৎসার শরণাপনড়ব হয়। এতে রোগ যন্ত্রণা কমার পরিবর্তে, কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্ভোগ আরো বাড়বে। যে রোগীটির প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছিল, সে রোগীটি শেষ পর্যায় এসে রোগযন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের
শরণাপনড়ব হয়। যে রোগীকে ৪ জন মিলে হাসপাতালে নিয়ে আসে কোলে করে একেবারে নিস্তেজ অবস্থায়, তাকে ক্যান্সারের চিকিৎসা প্রয়োগ করলে বরং তার মৃত্যু আরো তরান্বিত হয়। কারণ ক্যান্সার বিধ্বংসী এই বিষ হজম করার শক্তি তখন রোগীর দেহে থাকেনা। ক্যান্সার রোগকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট শারীরিক শক্তিও প্রয়োজন। এবার ক্যান্সার চিকিৎসার ঔষধ প্রসঙ্গে আসি। আমরা চিকিৎসার জন্য যে ঔষধ ব্যবহার করি তার সবগুলোই বিদেশ থেকে
আসে। এতে করে ঔষধের দাম অনেক বেশি পড়ে, এখন দেশেতৈরি হয় বলে কম দাম পরে। যদি ৩০ লক্ষ ক্যান্সার রোগীর মধ্যে অর্ধেক লোকও চিকিৎসার আওতায় আসে, তবুও অনেক চাহিদা।দেশীয় ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন μমেই ক্ষতি হবেনা। যদি তারা এ ঔষধ গুলো প্রস্তুত করার জন্যে উদ্যোগ নেয় এতে লাভ হবে রোগীর, দেশের মানুষের এবং ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর।সবশেষে একটি গল্প বলে শেষ করছি। একবার আমেরিকায় গিয়েছিলাম এর সম্মেলনে। এটি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের সর্বোচ্চ এবং সর্ববৃহৎ সম্মেলন। প্রায় ৩০ হাজার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এবং ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত লোকজন এতে অংশগ্রহণ করে। দেখা হয়েছিল ক্যান্সারের ঔষধ উৎপাদনকারী কোন সংস্থার বড় কর্মকর্তার সাথে। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে খুব আগ্রহী হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তাদের একটি ক্যান্সারের ঔষধের নাম শুনেছি কিনা।আমি বললাম, শুনেছি এবং রোগীর জন্য ব্যবহারও করেছি। তিনিআমাকে বললেন, ওটাতো আমরা তোমাদের দেশে পাঠাই না, তা হলে তোমরা কিভাবে পাও? আমি জানালাম, কিভাবে আসে আমি জানি না, তবে আমাদের বাজারে পাওয়া যায়।তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা আমাদের দেশে ঔষধটি পাঠাও না কেন? একটু ইতস্তত করে বললো দেশটি এত গরিব যে লোকজন ঔষধ কিনতে পারবে না।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “দেশটিকেকেন গরিব মনে করো?” তিনি বললেন, “তিন বেলা খেতে পারে না এমন গরিব, আমি বললাম তোমার কথা হয়তো ঠিক, তবে আমার দেশের জনসংখ্যা কতো জানো? ১৪ কোটি, যার শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ হয়তো তোমার কথামত গরিব। কিন্তু ১০ ভাগ অর্থাৎ১ কোটি ৮০ লক্ষ লোক যা উনড়বত দেশ নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দুবাই এর জনসংখ্যা যোগ করলেও এর মতো হবে না, এরা তো গরিব নয়। এই ১০ ভাগ এত বেশি ধনী যে, ইচ্ছা করলে শুধু ঔষধটি নয়, আমার মনে হয় তোমার পুরো কোম্পানিটিকেও কিনে ফেলতে পারবে এমন লোকও বেশ আছে। ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর আমাকে করমর্দন করে কাছে টেনে নিয়ে শুভেচ্ছাজানালেন। এই ১০ ভাগ লোক বিদেশে গিয়ে এ চিকিৎসার পেছনে যে পরিমাণ টাকা খরচ করে আসে, তার কিছুটাও যদি ব্যয় করে এ চিকিৎসার জন্য উনড়বত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি গড়ে তোলেন, তবে আমাদের হয়তো আর পেছনে তাকাতে হবে না।ক্যান্সার রোগীর প্রেসার পরীক্ষা











